বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

বিশ্ব রাজনীতির মোড়: ইরান সংঘাত ও পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত: পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা কতটা বাস্তব ?

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ডেভিড স্যাকস সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, চরম পরিস্থিতিতে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র বিবেচনা করতে পারে, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অস্বীকার করেছেন। বিশ্লেষকদের একাংশ এমন ঝুঁকি উড়িয়ে দিচ্ছেন না, আবার কেউ বলছেন সম্ভাবনা কম। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চাপে পড়লে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার সমাধান নয় এবং এর বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হবে।

হোয়াইট হাউসের এআই ও ক্রিপ্টো প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন ডেভিড স্যাকস। তার মতো কোনো শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা ও তা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে এমন খোলাখুলি বক্তব্য সম্ভবত এটিই প্রথম। এতেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।

প্রথাগত প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা না হয়েও স্যাকস এ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এ ‘ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ’ থেকে ‘বিজয় ঘোষণা করে বেরিয়ে আসার’ পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তার এ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, ‘ইসরায়েল এমনটি করবে না। ইসরায়েল কখনোই তা করবে না।’

ট্রাম্প আশ্বস্ত করলেও অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকই পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ারশেইমার মিডল ইস্ট আ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইরানে যদি ইসরায়েল হেরে যায় এবং তারা যদি প্রথাগত উপায়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে থামাতে না পারে, তবে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাববে। আমরা জানি, এই গ্রহে ইসরায়েলের চেয়ে বেশি নির্মম আর কোনো রাষ্ট্র নেই।’

এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধে ইরানে ১ হাজার ৫০০ এবং লেবাননে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলে ১৫ জন এবং ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে। হামলা ও পাল্টা হামলার এ চক্র পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে মোড় নেবে কি না, তা নিয়ে উৎকণ্ঠাকে একেবারে অমূলক বলার সুযোগ নেই।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ইমেরিটাস অধ্যাপক থিওডোর পোস্টলও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিকল্পহীন হয়ে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্র বেছে নিতে পারেন, যা ইরানের দিক থেকেও পাল্টা আঘাত ডেকে আনবে। এমনকি ইরানকে যদি তড়িঘড়ি করে কোনো ডিভাইস তৈরি করতে হয় তবুও।

এদিকে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক বিপর্যয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক হানান বালখি জানান, জাতিসংঘ কর্মীরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা বা ঘটনা, যা আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।’ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা বা অস্ত্রের ব্যবহার, উভয় পরিস্থিতির জন্যই তারা সতর্ক রয়েছেন।

ওয়াশিংটনের আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল জি কিমবল অবশ্য মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা উচিত। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি বা ব্যবহার এ যুদ্ধের কোনো সমাধান নয়। ইতিহাস বলে, অপারমাণবিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হুমকি দিয়ে তাদের আচরণ পরিবর্তন বা আত্মসমর্পণ করানো যায় না।’

তবে কিমবল একটি ভয়ের জায়গাও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু উভয়ের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একক এবং প্রায় অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা রয়েছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই কাজ করছেন।’

যুদ্ধ শুরুর চার সপ্তাহ পার হতে চললেও ইরানের লড়াই করার সক্ষমতা এখনো অটুট। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হলেও ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইল হামলা থামেনি। ২০ শতাংশ বিশ্ব তেলের করিডোর হরমুজ প্রণালিতেও ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রিচার্ড গোয়ান অবশ্য পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এখনো কম বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন মনে করছে, তাদের প্রথাগত হামলা সফল হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার জন্য পারমাণবিক হামলা কোনো ভালো বিকল্প নয়। তা ছাড়া ট্রাম্পের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের সুস্থ ভয় কাজ করে, তাই তিনি হয়তো এ পথে হাঁটবেন না।’

গোয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তবে আরব বিশ্বসহ পুরো পৃথিবী এর নিন্দা জানাবে এবং এটি রাশিয়া বা চীনের মতো দেশগুলোর জন্য ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একটি অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে।

সোর্স : কালবেলা

নিউজটি শেয়ার করুন

All rights reserved © meghnapost.com